প্রস্রাবে সামান্য জ্বালাপোড়া। এইটুকু থেকেই শুরু হয়েছিল সব...see more
প্রস্রাবে সামান্য জ্বালাপোড়া। এইটুকু থেকেই শুরু হয়েছিল সব।
একজন ৪৫ বছর বয়সী গৃহিণী। হালকা ডায়াবেটিস ছিল তার, কিন্তু নিয়মিত চেকআপ করাতেন না, ওষুধও মাঝেমধ্যে বাদ দিতেন। একদিন প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া শুরু হলো, বারবার প্রস্রাবের বেগও হচ্ছিল। তেমন পাত্তা দেননি "এইটুকু সমস্যা তো এমনিতেই সেরে যাবে।"
তিনদিন পর তলপেটে ব্যথা শুরু হলো, সাথে হালকা জ্বর। পাশের ফার্মেসিতে গিয়ে সমস্যাটা বললেন। দোকানদার প্রেসক্রিপশন ছাড়াই একটা এন্টিবায়োটিক ধরিয়ে দিলেন - "পাঁচ দিন খান, সেরে যাবেন।"
দুদিন খাওয়ার পরই ব্যথা কমে এলো। রেহেনা বেগম ভাবলেন, সেরে গেছে। বাকি ওষুধ আর খেলেন না - কষ্টের টাকা বাঁচলো, মনে হলো তার।
কিন্তু আসল বিপদ তখনই শুরু হলো।
যে ব্যাকটেরিয়াগুলো দুর্বল ছিল, ওষুধে সেগুলো মরে গিয়েছিল। কিন্তু যেগুলো একটু বেশি শক্তিশালী, একটু resistant - সেগুলো বেঁচে গেল। আর বেঁচে থাকা এই ব্যাকটেরিয়াগুলোই এখন নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করতে লাগলো।
এক সপ্তাহ পর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর উঠলো। কোমরের দুপাশে, পিঠের দিকে তীব্র ব্যথা শুরু হলো - জীবাণু দিয়ে ইনফেকশন ততক্ষণে কিডনি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার দেখালেন এবার। আরেকটা এন্টিবায়োটিক দেওয়া হলো। কিন্তু জ্বর কমলো না, বরং বাড়তে লাগলো। রক্তচাপ কমে যেতে লাগলো।
ইনফেকশনের জীবাণু ততক্ষণে রক্তে মিশে গেছে - ডাক্তাররা যাকে বলেন সেপসিস। ব্যাকটেরিয়া এখন শুধু কিডনিতে না, পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কালচার রিপোর্ট এলো তিনদিন পর - লেখা ছিল, ব্যাকটেরিয়াটি প্রায় সব সাধারণ এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে গেছে। ডাক্তাররা একের পর এক শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক দিতে লাগলেন - কোনোটাই কাজ করলো না।
রক্তচাপ ধরে রাখা যাচ্ছিল না, কমে যাচ্ছিলো। কিডনি বিকল হতে শুরু করলো। শ্বাসকষ্ট বাড়লো, ফুসফুসও আর ঠিকমতো কাজ করছিল না।
আইসিইউতে নেওয়া হলো। ভেন্টিলেটর লাগানো হলো, ডায়ালাইসিস শুরু হলো। পরিবার জমি বিক্রি করে, ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করছিল - শুধু একটা আশায়, "মানুষটা ফিরে আসুক।"
শেষ চেষ্টা হিসেবে ডাক্তাররা সবচেয়ে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক, কলিস্টিন দিলেন - যেটাকে বলা হয় চিকিৎসার "শেষ অস্ত্র"। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। একে একে অঙ্গগুলো বিকল হতে লাগলো - হৃদপিণ্ড, কিডনি, ফুসফুস, সব একসাথে।
দশ দিনের আইসিইউ যুদ্ধের পর, আর ফেরা হলো না।
প্রস্রাবের সামান্য জ্বালাপোড়া থেকে শুরু হওয়া যাত্রাটা শেষ হলো একটা পরিবারের কান্নায়। ঘরে রেখে যাওয়া তার সন্তানেরা মা'কে হারালো।
ডাক্তার তখন পরিবারকে যা বললেন, সেটাই সবচেয়ে কষ্টের কথা - "আমরা প্রায় সব ধরনের এন্টিবায়োটিক ট্রাই করেছি, কিন্তু ব্যাকটেরিয়াটা এতটাই রেজিস্ট্যান্স হয়ে গিয়েছিল যে কোনো ওষুধই আর কাজ করছিল না।"
এটা গল্প মনে হচ্ছে তাই না? বাংলাদেশের আইসিইউতে এরকম হাজারো রোগী প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন, শুধু একটা কারণে - এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।
আর এই রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় আমাদের নিজেদের হাত দিয়েই -
- প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিক কেনা।
- কোর্স শেষ না করে মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া।
- সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো ভাইরাস দিয়ে হওয়া সাধারণ অসুখেও এন্টিবায়োটিক খাওয়া, যেখানে এন্টিবায়োটিকের আসলে কোনো কাজই নেই।
- আগের কেনা ওষুধ রেখে দিয়ে নিজে নিজে আবার খাওয়া।
প্রতিবার এভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে দুর্বল ব্যাকটেরিয়া মরে যায় ঠিকই, কিন্তু শক্তিশালী প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া টিকে থেকে বংশবিস্তার করে। একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কোনো এন্টিবায়োটিকই আর কাজ করে না।
এটা দূরের কোনো গল্প না। যেকোনো দিন, যেকোনো পরিবারে এটা ঘটতে পারে।
তাই, এন্টিবায়োটিক শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তার দেখান। আর একবার শুরু করলে পুরো কোর্স শেষ করুন - এক দিনও বাদ না দিয়ে।
আল্লাহ আমাদের এবং আমাদের প্রিয়জনদের হেফাজত করুন। সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।
- শাহরিয়ার আবদুল্লাহ, MBBS Final Year
🎁 Your Special Offer is Loading...
Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.
⏳ Stay here — your offer will open shortly.
✅ You can go back to this page anytime.

Comments
Post a Comment